আরো

    টার্কি পালনের বিস্তারিত তথ্য

    পরিচিতিঃ- টার্কি এক সময়ের বন্য পাখী হলেও এখন
    একটি গৃহ পালিত বড় আকারের পাখী । এটি গৃহে পালন
    শুরু হয় উত্তর আমেরিকায় । কিন্ত বর্তমানে
    ইউরোপ সহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশে এই পাখী কম – বেশী
    পালন করা হয় ।
    কেনো পালন করবেনঃ- বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টার্কি
    পাখির মাংস খুবই জনপ্রিয় । টার্কি বর্তমানে মাংসের
    প্রোটিনের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশের
    অর্থনীতিতে অবদান রাখছে । এর মাংসে প্রোটিন
    বেশী , চর্বি কম এবং আন্যান্য পাখীর মাংসের চেয়ে
    বেশী পুষ্টিকর ।পশ্চিমা দেশগুলোতে টার্কি ভীষণ
    জনপ্রিয় ।
    তাই সবচেয়ে বেশী টার্কি পালন হয় মার্কিন
    যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স,ইতালি,ন
    েদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড সহ অন্যান্য দেশে ।
    বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাধিক ছোট -বড় খামার রয়েছে।
    যেটা আমাদের জন্য সুখবর। এবং বেকার যুবকদের টার্কি
    পালনে আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আশা করা
    যায়, আগামী কয়েক বছরে এটা ব্যাপক ভাবে বিস্তার
    লাভ করবে ।
    টার্কি পালনের সুবিধাসমুহ —
    ১। মাংস উদপাদন ক্ষমতা ব্যাপক ।
    ২। এটা ঝামেলাহীন ভাবে দেশী মুরগীর মত পালন করা
    যায় ।
    ৩। টার্কি ব্রয়লার মুরগীর চেয়ে আনুপাতিক হারে দ্রুত
    বাড়ে ।
    ৪। টার্কি পালনে তুলনামূলক খরচ অনেক কম, কারন এরা
    দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি ঘাস,লতাপাতা,পোকা –
    মাকড় খেতে বেশী পছন্দ করে ।
    ৫। টার্কি দেখতে সুন্দর, তাই বাড়ির শোভা বর্ধন করে ।
    ৬। টার্কির মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ বেশী, চর্বি
    ০.৯৩% যেখানে গরু বা ছাগলে ২০% এর বেশি কিংবা
    খাসীর মাংসের বিকল্প হতে পারে ।
    ৭। টার্কির মাংসে অধিক পরিমাণ জিংক, লৌহ,
    পটাশিয়াম, বি৬ ও ফসফরাস থাকে । এ উপাদান গুলো
    মানব শরীরের জন্য ভীষণ উপকারী এবং নিয়মিত এই
    মাংস খেলে কোলেস্টেরল কমে যায় ।
    ৮। টার্কির মাংসে এমাইনো এসিড ও ট্রিপটোফেন
    অধিক পরিমাণে থাকায় এর মাংস খেলে শরীরে রোগ
    প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ।
    ৯। টার্কির মাংসে ভিটামিন -ই অধিক পরিমাণে থাকে

    টার্কি গ্রোথ বৈশিষ্ট —-
    ১। ডিম দেয়া শুরুর বয়স = ৩০ সপ্তাহ
    ৩। বছরে গড় ডিম = ১০০– ১৩০ টি ।
    ৪। ডিম ফুটে বাচ্চা বেড় হয় = ২৮ দিনে ।
    ৫। ২০ সপ্তাহে গড় ওজন পুরুষ পাখী = ৭ –৮ কেজি ।
    স্ত্রী পাখী = ৪ – ৫ কেজি ।
    ৬। বাজারজাত করনের সঠিক সময় পুরুষ =১৮ – ২০সপ্তাহ ।
    ৭। উপযুক্ত ওজন পুরুষ পাখী = ৭ – ৮ কেজি ।
    স্ত্রী পাখী = ৫ – ৬ কেজি ।
    টার্কি পালন পদ্ধতি –
    মুক্ত অবস্থায় ও আবদ্ধ অবস্থায় পালন করা যায় । বাড়ির
    ছাদেও টার্কি পালন সম্ভব। টার্কি যথেষ্ট গরম বা শীত
    সহ্য করতে পারে যা আমাদের দেশের সাথে মানানসই।
    দেশি মুরগীর মতই মা-বোনেরা এটা পালন করতে
    পারেন।
    লিটার ব্যাবস্থাপনাঃ
    এই পদ্ধতিতে টার্কির জন্য সহজলভ্য দ্রব্য ব্যাবহার করা
    যায় । যেমন নারিকেলের ছোবড়া, কাঠের গুরা, তুষ,
    বালি । প্রথমে ২ ইঞ্চি পুরু লিটার
    তৈরি করতে হয় । পরে আস্তে আস্তে আরো উপাদান
    যোগ করে ৩ – ৪ ইঞ্চি
    করলে ভালো হয় । লিটারে সব সময় শুকনো দ্রব্য ব্যাবহার
    করতে হবে ।
    ভিজা লিটার তুলে সেখানে আবার শুকনো লিটার দিয়ে
    পূর্ণ করতে
    হবে । আমার পরামর্শ সব থেকে কম খরচের জন্য মেয়ে
    পাকা না করে ধুলাবালি দিয়ে ভরাট করে তার উপরই
    টার্কি পালন করলে লিটার পরিবর্তনের খরচ বেচে
    যাবে। তবে এক্ষেত্রে ২০দিন পরপর মেঝেতে গুড়াচুন
    এবং জীবানুনাশক ব্যবহার করতে হবে।
    * খাবার –
    টার্কির খাবার সরবরাহের জন্য দুইটি পদ্ধতি ব্যাবহার
    করা যায় । যেমন
    ম্যাশ ফিডিং ও পিলেট ফিডিং । একটি আদর্শ খাদ্য
    তালিকা নিচে দেয়া হলো –
    ধান ————— ২০%
    গম —————- ২০%
    ভুট্টা ————— ২৫%
    সয়াবিন মিল ——- ১০%
    ঘাসের বীজ ——– ৮%
    সূর্যমুখী বীজ ——- ১০%
    ঝিনুক গুড়া ——– ৭%
    মোট = ১০০%
    ঝামেলা এড়াতে বাজার থেকে লেয়ার ফিডও কিনে
    খাওতে পারেন।
    * সতর্কতা –
    অন্যান্য পাখির তুলনায় টার্কির জন্য বেশী ভিটামিন,
    প্রোটিন, আমিষ, মিনারেলস দিতে হয় । কোন ভাবেই
    মাটিতে খাবার সরবরাহ করা যাবে না । সব সময়
    পরিষ্কার পানি দিতে হবে ।
    * সবুজ খাবার –
    সব সময় মোট খাবারের সঙ্গে ৪০-৫০% সবুজ ঘাস খেতে
    দেয়া ভালো । সে
    ক্ষেত্রে নরম জাতীয় যে কোন ঘাস দেয়া যেতে পারে ।
    যেমন – কলমি,
    হেলেঞ্চা, কচুরিপানা, ইত্যাদি । আমার ব্যক্তিগত
    পরামর্শ নিয়োমিত কিছুপরিমাণ দুবলা ঘাস এবং নিম
    পাতা খাওয়াবেন। একটি পূর্ণ বয়স্ক টার্কির দিনে ১৪০
    – ১৫০ গ্রাম খাবার দরকার হয় । যেখানে ৪৪০০ – ৪৫০০
    ক্যালোরি নিশ্চিত করতে হবে।
    * প্রজনন ব্যাবস্থা –
    একটি টার্কি মুরগীর জন্য ২ – ৩ বর্গ ফুট জায়গা নিশ্চিত
    করতে হবে । ঘরে
    পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের ব্যাবস্থা থাকতে হবে । ঘর
    পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে । একটি মোরগের সঙ্গে
    ৩ বা ৪ টি মুরগী রাখা যেতে পারে । ডিম সংগ্রহ
    করে আলাদা জায়গায় রখতে হবে সরাসরি হাতের স্পর্শ
    ছাড়া। ডিম প্রদান কালীন সময়ে টার্কিকে আদর্শ
    খাবার এবং বেশী পানি দিতে হবে ।
    * বাচ্চা ফুটানো –
    টার্কি নিজেই ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায় । তবে
    দেশী মুরগী অথবা ইনকিউবেটর দিয়ে বাচ্চা ফুটালে ফল
    ভালো পাওয়া যায় কিন্তু নতুনরা অবশ্যই মুরগী দিয়ে
    ডিম ফুটাবেন, এতে মুরগীই বাচ্চার যত্ন নিবে। তাছাড়া
    বাচ্চা উৎপাদনের জন্য সময় নষ্ট না হওয়ার কারণে
    টার্কিও ডিম উৎপাদন বেশী করে ।
    * রোগ বালাই –
    পক্স, সালমোনেলোসিস, কলেরা, মাইটস ও এভিয়ান
    ইনফুলেঞ্জা বেশী
    দেখা যায় । পরিবেশ ও খমার অব্যাবস্থাপনার কারণে
    অনেক রোগ
    সংক্রমণ হতে পারে । পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে রোগ
    হয়না বললেই চলে।
    * টিকা প্রদান—-
    ১ম দিন ———- এন ডি ( বি১স্টেরেইন ) ।
    ৪ ও ৫ সপ্তাহে —- ফাউল পক্স ।
    ৬ সপ্তাহে ———- এন ডি ।
    ৮ – ১০ সপ্তাহে –- ফাউল কলেরা ।
    সতর্কতাঃ– কোন অবস্থায় রোগাক্রান্ত পাখিকে
    টিকা দেয়া যাবে না। টিকা প্রয়োগ করার পূর্বে
    টিকার গায়ে দেয়া তারিখ দেখে নিবেন।
    * বাজার সম্ভবনা –
    • টার্কির মাংস পুষ্টিকর ও সুস্বাদু হওয়ায় এটি খাদ্য
    তালিকার একটি আদর্শ মাংস হতে পারে। পাশাপাশি
    দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাংসের চাহিদা
    মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে । যাদের
    অতিরিক্ত চর্বি যুক্ত
    মাংস খাওয়া নিষেধ অথবা যারা নিজেরাই এড়িয়ে
    চলেন, কিংবা
    যারা গরু / খাসীর মাংস খায়না , টার্কি তাদের জন্য
    হতে পারে প্রিয়
    একটি বিকল্প ।
    *বর্তমানে ছোট আকারের খামার করার যে চাহিদা
    দেশ ব্যাপী তৈরি হয়েছে, তাতে আগামী ৩/৪ বছরে
    কয়েক লাখ টার্কির প্রয়োজন হবে এবং সে ক্ষেত্রে
    দাম ও বেশী পাওয়া যাচ্ছে । ৩০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা
    পর্যন্ত বয়স ও রং ভেদে টার্কির জোড়া কেনা – বেচা
    চলছে ।
    আপনি কেন টার্কির খামার করবেন ??
    • যারা বেকার বসে আছেন * যারা নতুন কিছু শুরু করতে
    চান * পোল্ট্রি
    ব্যবসা করে যারা লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন এবং
    আপনার স্থাপনা এখন কোন কাজে আসছে না।
    * যারা কম ঝামেলা পূর্ণ কাজ পছন্দ করেন এবং ভালো
    আয়ের উৎস খুজছেন
    * যারা অল্প পুঁজি এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা খুজছেন,
    টার্কির খামার তাদের জন্য আদর্শের ।
    কারন হিসেবে আমার অভিমত – ১। একটি আদর্শ টার্কি
    খামার করতে খুব বেশী পুঁজির প্রয়োজন হয় না ।
    ২। অন্যান্য পাখীর তুলনায় এর রোগ বালাই কম এবং কিছু
    নিয়ম মেনে চললে এই খামারে ঝুঁকি অনেক কম ।
    ৩। যেহেতু ৫০% পর্যন্ত ঘাস দেয়া যায়, তাই খবারে খরচ
    কম ।
    ৪। বাজার চাহিদা প্রচুর ।
    ৫। উচ্চ মুল্য থাকায় খরচের তুলনায় আয় অনেক বেশী ।
    আমার নিজ অভিজ্ঞতাঃ
    ৩মাস পূর্বে বন্ধু এবং ফেসবুকের বন্ধুদের দেখে সিদ্ধান্ত
    নেই টার্কি খামার করার। এ বিষয়ে আরও জানতে ২০০০
    টাকা যাতায়ত ভাড়া খরচ করে প্রায় ১২টা টার্কি
    খামারে ২ সপ্তাহ সময় নিয়ে ভ্রমণ করি। এরপর ১০ হাত
    প্রস্থ এবং ১৫ হাত দৈর্ঘ্য এর একটি হাফ ওয়াল করে টিন
    ও নেট দিয়ে খামার ঘর করি। এতে খরচ হয় ২০,০০০টাকা।
    এরপর মোট ২৫,০০০ টাকা দিয়ে ১টা মেল, ৩টা এডাল্ট
    মুরগী, ১২ পিস ৭দিন বয়সী বাচ্চা এবং ১০টা ডিম ক্রয়
    করি। ঔষধ ক্রয় করি আরো ১০০০ টাকার। শুরুতে সব
    মিলিয়ে ৫০,০০০টাকা খরচ হয়।এই মাসেই ৪টা মুরগীর তা
    থেকে ৩৫+ বাচ্চা ফুটবে আশা রাখি। যথেষ্ট ভালো
    অবস্থানে আছে আমার খামারটি। আমার চাকুরীর
    ব্যস্ততার কারণে আম্মুই দেখাশোনা করেন আমার
    খামারের।
    বি :দ্র : খামার করতে আগ্রহী হলে বাজার থেকে বা
    আমদানী করা বড়
    বা বাচ্চা পাখী ক্রয় করবেন না । অবশ্যই প্রকৃত
    খামারিদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০জোড়া পাখী
    সংগ্রহ করবেন । একমাস লালনপালন শেষে আপনার
    অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রয়োজন মতো পালন করুন। মনে
    রাখবেন, খামার করতে গেলে সুস্থ্য, রোগ মুক্ত পাখী
    সংগ্রহ করতে পারলে আপনার সফলতার হার বেড়ে যাবে,
    সকলের জন্য শুভ কামনা করছি। ভুলত্রুটি মার্জনীয়। যে
    কোন মতামত কমেন্টে জানাবেন।

    রিলেটেড আর্টিকেল

    সামাজিক যোগাযোগ

    9,748,568ভক্তমত
    1,567,892অনুগামিবৃন্দঅনুসরণ করা
    56,848,496গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব
    - Advertisement -

    সর্বশেষ আর্টিকেল

    জনপ্রিয় আর্টিকেল

    error: Content is protected !! Don\'t try to copy!!!