আরো

    খাদ্য হিসেবে গরুর চামড়া ও ভুড়ি প্রচলন, পুষ্টিমান বিশ্লেষণ ও ধর্মীয় বিধান – সজীব আহম্মেদ

    গরু,ছাগল জবাইয়ের পর ভুড়ি ও চামড়া উপজাত হিসাবে পাওয়া যায়। আগের দিনে গরুর ভুড়ি ফেলে দেয়া হতো ও চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন প্রকার চামড়াজাত পন্য ও পোষাক তৈরি করা হতো এখনো হয়। সারাবছর যেপরিমান গবাদিপশু জবাই হয় তার প্রায় অর্ধেক কুরবানির ঈদে হয়। আগের দিনে গবাদিপশুর উপজার ভুড়ি ও খাদ্যনালী খাওয়ার প্রচলন না থাকলে ও এখন ভুড়ি একটি জনপ্রিয় খাবার। গরুর চামড়া ও চামড়াজাত পন্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় রপ্তানি পন্য হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে কোরবানির সময় গবাদীপশুর চামড়ার সুষ্টু ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক চামড়া নষ্ট হচ্ছে। কয়েকবছর আগে যে চামড়ার মুল্য ছিল ২-৩ হাজার তার মুল্য দাড়িয়েছে ৪০০-৫০০ টাকা তাই ন্যায্য মুল্যের অভাবে অধিকাংশ চামড়া অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে অথবা নষ্ট করা হচ্ছে।

    তাই এত বিপুল পরিমান চামড়া এত সস্তায় না দিয়ে অথবা ফেলে নষ্ট না করে এর বিকল্প ব্যবহার বের করতে হবে। একসময়ের ভুড়ি ও খাদ্যনালী খাদ্য হিসাবে অপ্রচলিত হলেও সময়ের পরিবর্তনে এখন জনপ্রিয় খাবার। গবাদিপশুর চামড়া ও খাদ্য হিসাবে যথেষ্ট পুষ্টিকর ও সুস্বাদু।

    চার-পাচ মন গরুর চামড়া থেকে প্রায় ১৫-২০ কেজি খাদ্য উপযোগী চামড়া পাওয়া যায়।

    বাংলাদেশের সব এলাকায় খাদ্য হিসাবে চামড়ার প্রচলন না থাকলেও বৃহত্তর চট্রগ্রামের কোন কোন এলাকায় পশুর চামড়ার তৈরি খাবারের প্রচলন আছে। তবে অনেক দেশে চামড়া দিয়ে নানান স্বাদের খাবার তৈরির প্রচলন অনেক আগে থেকেই আছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া,নাইজেরিয়ার মত মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা অনেক আগে থেকেই চামড়ার তৈরি খাবার খেয়ে থাকেন। তাই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ভুড়ি,খাদ্যনালীর মত চামড়া খাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠলে চামড়ার অপচয় রোধ করে পুষ্টিমান গ্রহন করা যায়।

    রান্না করার পরে গরুর চামড়া

    চামড়া ও ভুড়ি কোনটি অধিক পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত?

    পুষ্টিমান ও স্বাস্থকর খাবার বিবেচনা করলে ভুড়ির চেয়ে চামড়া অনেক বেশী পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। ভুড়িতে প্রচুর পরিমান কোলেস্টেরল থাকে প্রতি ১০০ গ্রান ভুড়িতে ১৫৭ মিঃগ্রাম। একজন হার্টের রোগী দিনে সর্বোচ্চ ২০০ মিঃগ্রাম কোলেস্টেরল খেতে পারবেন এবং একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ দিনে ৩০০ মিঃগ্রাম কোলেস্টেরল খেতে পারবেন। অর্থাৎ একজন সুস্থ মানুষের দৈনিক কোলেস্টেরল গ্রহনের নিরাপদ মাত্রা ৫০% ও একজন হার্টের রোগীর দিনে কোলেস্টেরল গ্রহনের নিরাপদ মাত্রার ৭৯% আসে শুধুমাত্র ১০০ গ্রাম ভুড়ি খেলে। অন্যান্য খাবার থেকে তো কোলেস্টেরল আসেই। তাছাড়া চামড়ার তুলনায় ভুড়িতে ফ্যাটের পরিমান ও বেশী।

    প্রসেস করার পরে গরুর চামড়া

    প্রতি ১০০ গ্রাম ভুড়ি ও চামড়ার খাদ্যমান বিশ্লেষণঃ

    প্রতি ১০০ গ্রাম ভুড়িতে আছেঃ

    • শক্তিঃ ৮৫ কিঃক্যালরি
    • আমিষঃ১২.০৭ গ্রাম চর্বিঃ ৩.৬৯ গ্রাম
    • পানিঃ ৮৪.১৬ গ্রাম
    • কিছু পরিমানে জিংক,সেলেনিয়াম,লোহা ও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।

    প্রতি ১০০ গ্রাম চামড়াতে আছেঃ

    • শক্তিঃ ২২৫ কিলোক্যালরি
    • আমিষঃ ৪৬.৯ গ্রাম
    • শর্করাঃ ৬.৮০ গ্রাম
    • চর্বিঃ ১.০৯ গ্রাম
    • ফাইবারঃ০.০২ গ্রাম
    • পানিঃ ৪৩.৯ গ্রাম
    • এছাড়াও ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম,ফসফরাস ও জিংক পাওয়া যায়।

    উপরের খাদ্য মান বিশ্লেষণে দেখা যায় সমপরিমাণ ভুড়ির চেয়ে চামড়ায় প্রায় ৩ গুন বেশী শক্তি পাওয়া যায় আবার ক্ষতিকর চর্বি ও খুব কম।

    গরুর চামড়ার প্রোটিন সাধারণত জিলাটিন হিসাবে থাকে। জিলাটিন হাড় ও ত্বক গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী মায়েদের আরো বেশী প্রয়োজন কারন মায়ের পুষ্টি শোষিত হয়ে বাচ্চার দেহ ও হাড় গঠন হয়ে থাকে।

    রান্না করা গরুর চামড়া পরিবেশন

    ইসলামের দৃষ্টিতে চামড়া ও ভুড়িঃ

    ইসলামিক শরীয়ত মোতাবেক জবাইকৃত হালাল প্রানী ৭ টি অংঙ্গ হারাম

    • ১. প্রবাহিত রক্ত
    • ২. নর প্রানীর পুংলিংগ
    • ৩. অন্ডকোষ
    • ৪. মাদি প্রানীর স্ত্রী লিংগ
    • ৫. মাংসগ্রন্থি
    • ৬. মুত্রথলি
    • ৭. পিত্তথলি

    তাই জবাইকৃত হালাল প্রানীর ভুড়ি,খাদ্যনালী ও চামড়া হালাল খাওয়ার বৈধতা আছে।

    তবে ভুড়ির সাথে গরীবের হক বা অন্য কোন ধর্মীয় বিধান নেই তাই ভুড়ি নিয়ে বিতর্ক অথবা অন্য আলোচনা নেই। তবে চামড়ার সাথে নির্দিষ্ট ধর্মীয় নির্দেশনা দেয়া আছে তাহল কোরবানির চামড়া দান করা উত্তম। তবে কোরবানি দাতা যদি চামড়া ব্যবহার করতে চায় তবে তিনি চামড়া নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন অথবা দান করতে হবে। তবে কোরবানি দাতা চামড়া বিক্রি করলে সেই টাকা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেনা সেই টাকা অবশ্যই দান করা লাগবে।

    কোরবানির চামড়ার টাকা গরীবদের হক,কিন্তু আমাদের দেশে বিগত কয়েকবছরে অসাধু চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারনে চামড়ার ন্যায্য মুল্য থেকে গরীবেরা বঞ্চিত হচ্ছে। তাই চামড়া নিজে খাবার হিসাবে গ্রহন করে এর ন্যায্য মুল্যমান গরীবদেরকে বিলিয়ে দেয়া চামড়া সিন্ডিকেটদের জন্য উপযুক্ত জবাব হবে। যেহেতু ভুড়ির মত চামড়া ও হালাল শরীয়তে কোন নিষেধ নেই তাই চামড়ার পুষ্টি ও স্বাস্থগুন বিবেচনায় ভুড়ির পাশাপাশি চামড়া খাওয়ার প্রচলন করা উচিত।

    আপনিই এখন সিদ্ধান্ত নিন আপনার কোরবানির চামড়া সিন্ডিকেটের হাতে দিয়ে গরীবের ন্যায্য হক নষ্ট করবেন নাকি নিজে খেয়ে ন্যায্য মুল্য নির্ধারণ করে গরীবের হক্ব আদায় করবেন..!!! সিদ্ধান্ত আপনার।

    লেখকঃ

    মোঃ সজিব রানা

    ডিভিএম,হাবিপ্রবি

    দিনাজপুর

    রিলেটেড আর্টিকেল

    সামাজিক যোগাযোগ

    9,748,568ভক্তমত
    1,567,892অনুগামিবৃন্দঅনুসরণ করা
    56,848,496গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব
    - Advertisement -

    সর্বশেষ আর্টিকেল

    জনপ্রিয় আর্টিকেল

    error: Content is protected !! Don\'t try to copy!!!